বীরভূমের এক গ্রামে একজন পটুয়া গান ধরলেন। কণ্ঠে রামের বিরহ-বেদনা, হাতে রঙিন পটের সারি — রামের জন্ম, সীতার হরণ, লঙ্কার আগুন। গ্রামের মানুষ ঘিরে বসেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সকলের চোখে একই রাম — কাঁদছেন, লড়ছেন, হারছেন, জিতছেন। পটুয়ার নাম আব্দুল করিম। ধর্মীয় পরিচয়ে তিনি একজন মুসলমান।
এই দৃশ্য আজকের ভারতে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলার গ্রামে এটা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক — শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। মুসলমান পটুয়ার তুলিতে রামের ছবি আঁকা হয়েছে, মুসলমান সুলতানের দরবারে রামায়ণ বাংলায় অনূদিত হয়েছে, মুসলমান রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় রামের গল্প বাংলার প্রতিটি কোণে কোণে পৌঁছেছে।
এটা কোনো রাজনৈতিক সহিষ্ণুতার গল্প নয়; এটাই বাংলার নিশ্বাস ।
এবং সেই রাম — বাংলার রাম — উত্তর ভারতের রামের হুবহু ফটোকপি নন।
উত্তর ভারতের নীল রাম ও বাংলার সবুজ রাম
উত্তর ভারতের রাম নীলবর্ণ, রাজকীয় এবং মর্যাদাপুরুষোত্তম। তিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রতীক এবং মন্দির-রাজনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করেন। তাঁর নামে মিছিল বের হয়, ভোট পড়ে, সমাজ বিভক্ত হয়।
কিন্তু বাংলার রামের গায়ের রং সবুজ।
এটা কোনো রূপকথা নয়। হাওড়ার রামরাজতলায় আজও যে রামের পুজো করা হয়, তাঁর মূর্তির গায়ের রং সবুজ — “নব দূর্বাদল শ্যাম”, অর্থাৎ তাজা কচি ঘাসের মতো। এটি প্রকৃতির রাম, মাটির রাম। তিনি ক্ষমতার প্রতীক নন, বরং ভালোবাসা ও প্রেমের প্রতীক।
বাংলার রাম কাঁদেন। সীতার জন্য, মায়ের জন্য, বনবাসে রাজ্য ছেড়ে আসার তীব্র বেদনায় তিনি অশ্রু বিসর্জন করেন। তিনি জয়ী হন বটে, কিন্তু সেই জয়ে কোনো হিংস্র গৌরব নেই — আছে শুধু ক্লান্তি আর ঘরে ফেরার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
এই দুই রামের পার্থক্য কেবল ভৌগোলিক নয়, গভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক।
কৃত্তিবাস ওঝা ও বাংলা রামায়ণ
রামকে বাংলার মাটিতে নতুন করে জন্ম দিয়েছিলেন কৃত্তিবাস ওঝা।
পঞ্চদশ শতকে বাংলায় যখন মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠিত, তখন এই গৌড়ীয় কবি কৃত্তিবাস ওঝা বাল্মীকির রামায়ণকে বাংলার মাটিতে নিয়ে এলেন। কিন্তু তিনি কেবল বাল্মীকির সংস্কৃত শ্লোক অনুবাদ করলেন না — বরং সেটিকে বাঙালি সংস্কৃতিতে রূপান্তর করলেন। বাল্মীকির যুদ্ধবাজ দেবতাকে তিনি বাংলার সাধারণ মানুষের ঘরের মানুষ বানালেন।
কৃত্তিবাসের রাম হলেন বাঙালির জামাই। তিনি সংসারে আটকা পড়েন, মায়ের কথায় বনবাসে যান, এবং সীতার বিরহে সাধারণ মানুষের মতো ডুকরে কাঁদেন। এই রামের মহত্ত্ব তাঁর দেবত্বে নয়, তাঁর গভীর মনুষ্যত্বে। এখানে রাম বীর, কিন্তু বাঙালি বীর — যিনি কঠোরতায় নয়, বরং কোমলতায় গড়া।
এই কৃত্তিবাসী রামায়ণ কোথায় জন্ম নিল? ইতিহাস এখানে অত্যন্ত বিস্ময়কর। কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন, তৎকালীন বাংলার মুসলমান সুলতান রুকনুদ্দিন বারবক শাহের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এই রামায়ণ অনূদিত হয়েছিল। যদিও তথ্যে কিছু বিতর্ক আছে — কিন্তু বিতর্কহীন ঐতিহাসিক সত্য হলো, এই রামায়ণ রচিত হয়েছিল এমন এক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে যেখানে মুসলমান শাসকের দরবারে হিন্দু কবি রাম-কাহিনি গাইছেন এবং প্রজারা কেউ সেটাকে অদ্ভুত মনে করছেন না।
কারণ বাংলার সুলতানরা ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া।
বাংলার সুলতানরা
শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ যখন চতুর্দশ শতকে সমগ্র বাংলার ঐক্যবদ্ধ সুলতানি প্রতিষ্ঠা করলেন এবং দিল্লির অধীনতা প্রত্যাখ্যান করে “শাহ-ই-বাঙ্গালা” উপাধি নিলেন, তখন একটি সংকেত স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাংলার শাসন দিল্লির ইসলামি শাসনের অন্ধ অনুকরণ নয়; এই মাটির নিজস্ব একটি চরিত্র ও রং আছে।
সেই অসাম্প্রদায়িক রং সবচেয়ে স্পষ্ট রূপ পায় হোসেনশাহি আমলে।
আলাউদ্দিন হোসেন শাহ — যাঁর শাসনকালকে বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণযুগ মনে করা হয় — তাঁর রাজত্বে হিন্দু এবং মুসলমান পাশাপাশি রাজকীয় প্রশাসনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন শ্রীচৈতন্যদেবের ভক্তিআন্দোলনের পরোক্ষ রক্ষক ও পৃষ্ঠপোষক। চৈতন্যের বৈষ্ণব সঙ্গীদের তিনি কারারুদ্ধ করেননি, বরং তাঁদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।
শুধু তাই নয়, হোসেন শাহের অধীনে চট্টগ্রামের প্রাদেশিক শাসনকর্তা পরাগল খান ও ছুটি খান রাজকবি কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও শ্রীকর নন্দীকে দিয়ে মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করিয়েছিলেন। একজন মুসলমান নবাবের দরবারে বসে হিন্দু মহাকাব্যের বাংলা অনুবাদ হচ্ছে — এই দৃশ্যটুকু মাথায় রাখলে আজকের দক্ষিণ এশিয়ার বিভাজনের রাজনীতি অত্যন্ত তুচ্ছ মনে হয়।
এই সুলতানরা জোর করে সমীকরণ করতে চাননি। তাঁরা কেবল বাংলাকে ভালোবেসে শাসন করেছিলেন — আর বাংলা মানেই ছিল বহুত্ববাদ এবং সবকিছুকে আপন করে নেওয়ার নিজস্ব ক্ষমতা।
রামায়ণের পটচিত্র ও মুসলমান পটুয়ারা
বাংলার রামের গল্পে সবচেয়ে জীবন্ত ও সচল অধ্যায়টি হলো পটুয়াদের।
বীরভূম, মেদিনীপুর ও মুর্শিদাবাদের পটুয়া সমাজে এমন অনেক পরিবার আছেন যাঁরা ধর্মে ও আচারে মুসলমান। তাঁরা নিয়মিত নামাজ পড়েন এবং নামও ইসলামিক। কিন্তু পেশাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে তাঁরা রামায়ণের পটচিত্র আঁকেন এবং গ্রামে গ্রামে ঘুরে রামের গল্প সুরে সুরে শোনান। রামের জন্ম থেকে রাবণের মৃত্যু — সবই ফুটে ওঠে তাঁদের তুলির রেখায় আর কণ্ঠের সুরে।
এই পটুয়াদের কাছে রাম কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের একচেটিয়া সম্পত্তি নন। রাম তাঁদের কাছে একটি চিরন্তন গল্প, একটি সুপ্রাচীন সুরের আশ্রয়। রামের ছবি আঁকা মানে তাঁদের কাছে ধর্মান্তরিত হওয়া নয় — রামের ছবি আঁকা মানে খাঁটি বাঙালি হওয়া।
নামাজের সময় হলে এই পটুয়ারা নামাজ পড়েন, আবার নামাজ শেষে পটে তুলি ধরেন। এতে তাঁদের মনে কোনো দ্বিধা বা দ্বন্দ্ব থাকে না। কারণ বাংলার ঈশ্বর এবং বাংলার গল্প — এই দুটি কখনো একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না。
চন্দ্রাবতীর রামায়ণ: সীতার চোখে এক ভিন্ন রাম
ষোলো শতকের ময়মনসিংহের কবি চন্দ্রাবতী — যিনি বাংলার প্রথম মহিলা কবি — রচনা করলেন এক অন্য রামায়ণ। এই রামায়ণ মূলত সীতার চোখ দিয়ে দেখা। সেখানে রাম কোনো অভুল দেবতা নন — তিনি একজন রক্তমাংসের মানুষ, যিনি ত্রুটিপূর্ণ এবং অন্যায়কারী। আর সীতা? এই রামায়ণে তিনি রাবণের পত্নী মন্দোদরীর কন্যা, যাকে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল এবং যে মাটি ভেঙে জেগে উঠেছিল।
এই রামায়ণ ময়মনসিংহের মুসলমান-অধ্যুষিত গ্রামীণ সমাজে মেয়েরা বিয়ের গীত বা অন্নপ্রাশনের গান হিসেবে গাইতেন। চন্দ্রাবতীর রাম পৌঁছে গিয়েছিল সেই সব প্রান্তিক মানুষের কাছেও যাদের ঘরে রামের পুজো হয় না। রাম সেখানে কেবল একটি চিরায়ত লোকগল্পের নায়ক — এবং সেটুকুই বাংলার মানুষের কাছে যথেষ্ট ছিল।
বাংলার লোকভাষা ও ছড়ায় রাম
বাংলার লোকভাষায় রাম এতটাই ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছেন যে তাঁকে বাংলা সংস্কৃতি থেকে আলাদা করার কোনো উপায় নেই।
“সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই,” “ঘরের শত্রু বিভীষণ,” কিংবা “যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ” — এই প্রবাদগুলো বাংলার হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার মুখে মুখে ঘোরে। রামায়ণের চরিত্ররা বাংলার ভাষার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে গেছেন।
শৈশবের ভয়ের মুহূর্তে বাংলার গ্রামের শিশুরা নির্দ্বিধায় ছড়া কাটত:
ভূত আমার পূত, পেত্নী আমার ঝি।
রাম-লক্ষ্মণ সঙ্গে আছে, ভয়টা আমার কী।।
কে বলত এই ছড়া? হিন্দু শিশু নাকি মুসলমান শিশু? বাংলার অখণ্ড গ্রামে এই প্রশ্নটি কেউ কখনো করত না। কারণ রাম সেখানে কোনো সাম্প্রদায়িক উপাস্য নন — তিনি গ্রামের লোকজ স্মৃতি, ভাষা ও ঐতিহ্যের অংশ।
আজকের রামনবমী ও বাংলার সবুজ রাম
আজ যখন রামনবমীর মিছিলে ধারালো ত্রিশূল উঁচু হয়, যখন রামের নামে political স্বার্থে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসার দেয়াল তোলা হয় — তখন বাংলার ইতিহাস আমাদের একটি কঠিন প্রশ্ন করে।
আমরা আসলে কোন রামের কথা বলছি?
হোসেন শাহের দরবারে যে রামকাহিনির সুর প্রতিধ্বনিত হতো, বীরভূমের আব্দুল করিমের তুলিতে যে সবুজ রামের রূপ ফুটে উঠত, ময়মনসিংহের বিয়ের আসরে মেয়েরা যে রামের গান গাইতেন — সেই রাম কি আজকের দাঙ্গা বা হিংসাত্মক মিছিলের রামের সাথে এক?
না, তাঁরা কখনো এক নন।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি অমোঘ বাক্যে এই পরম সত্যটি ধরেছিলেন: “কবি, তব মনোभूमि রামের জনমস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।” কবির মনোভূমিতেই রামের আসল জন্ম। বাংলার কবির মন — তিনি হিন্দু হোন বা মুসলমান — সেই মনে যে রামের ছবি আঁকা হয়েছে, তিনি অযোধ্যার রামের চেয়ে অনেক বেশি বাঙালি ও অসাম্প্রদায়িক।
সেই রামকে কোনো সংকীর্ণ রাজনীতি দিয়ে গ্রাস বা দখল করা যায় না।
বাংলার মুসলমানের রাম কোনো সস্তা রাজনৈতিক আপোসের ফল নয়।
ইলিয়াস শাহ যখন বাংলাকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, তখন তিনি দিল্লির মনস্তুষ্টির কথা ভাবেননি। হোসেন শাহ যখন চৈতন্যের কীর্তনিয়াদের মুক্তি দিয়েছিলেন, তখন তাঁর মাথায় কোনো ভোটের হিসেব ছিল না। কিংবা মুসলমান পটুয়া যখন রামের পট আঁকেন, তখন তিনি নিজেকে উদার বা “সহিষ্ণু” দেখানোর প্রতিযোগিতায় নামেননি।
তাঁরা কেবল বাংলায় বসবাস করেছিলেন। আর বাংলায় থাকা মানেই হলো — এই লোকজ গান, এই রূপকথা, এই সুর এবং এই রাম — সবকিছুকে পরম মমতায় নিজের করে নেওয়া।
এটাই বাংলার সম্প্রীতির আসল রহস্য। এটি কোনো জোর করে চাপানো নীতি নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভালোবাসার ফসল। বাংলায় হিন্দু ও মুসলমান একসাথে থেকেছেন কারণ তাঁরা একে অপরকে সহ্য করেননি, বরং একে অপরের সংস্কৃতিকে ভালোবেসেছেন ও নিজের করে নিয়েছেন।
সেই সুরকে ভুলে যাওয়া মানে বাংলার আত্মাকেই মুছে দেওয়া। রাজনীতির রঙে সবুজ রামকে নীল করা যেতে পারে, কিন্তু সবুজের গভীর স্মৃতি কখনো মুছে ফেলা যায় না।