গত কয়েক বছরে “এআই কোন কোন চাকরি খাবে” এই শিরোনামে শতাধিক রিপোর্ট ও শতাধিক রিসার্চ পেপার বেরিয়েছে।
সমস্ত রিপোর্টেই নানা রকমের সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছিল। তবে সব ক্ষেত্রেই তাত্ত্বিক থিওরি এবং মানুষ এআই-এর ফ্রন্টিয়ার টপ মডেলগুলি সত্যি সত্যিই কী জন্য ব্যবহার করছে, সেটার মধ্যে একটি বড় তথ্যগত গ্যাপ ছিল। অবশেষে মার্চ, ২০২৬-এ অ্যানথ্রপিক (Anthropic) একটি যুগান্তকারী রিপোর্ট প্রকাশ করল — “Labor Market Impacts of AI: A New Measure and Early Evidence”। এই রিপোর্টে অ্যানথ্রপিক সেই জটিল তথ্যগত ঘাটতি পূরণ করল।
অ্যানথ্রপিকের রিপোর্টটিতে বিষয়টি দুটি সহজ প্রশ্নে ভাগ করা হয়েছে — প্রথম প্রশ্ন, এআই কি আজ এই কাজটা তাত্ত্বিকভাবে করতে সক্ষম? দ্বিতীয় প্রশ্ন, মানুষ কি সত্যিই এই কাজে এআই ব্যবহার করছে, এখন, বাস্তবে, প্রতিদিনের অফিসে?
একটি কাজ তখনই “কভার্ড” (Covered) বলে গণ্য হবে, যখন দুটো প্রশ্নেরই উত্তর হ্যাঁ। আর এখানেই প্রথম স্বস্তির খবর — সক্ষমতা আর প্রয়োগের মধ্যে একটা বিরাট ফাঁক আছে, যে ফাঁকে এখনও মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কম্পিউটার ও গণিত-সংক্রান্ত পেশায় চুরানব্বই শতাংশ কাজ তাত্ত্বিকভাবে এআই করতে পারে। বাস্তবে কভার্ড হয়েছে মাত্র তেত্রিশ শতাংশ। রূপান্তরটা ঘটছে, কিন্তু যতটা দ্রুত মানুষ ভয় পায়, ততটা দ্রুত নয়।

তবু যা ঘটছে, তা যথেষ্ট ভয়ংকর। আর ভয়ংকর এই কারণে নয় যে পরিসংখ্যানগুলোর ফিগার হিউজ — ভয়ংকর এই কারণে যে পরিসংখ্যানগুলোর আঘাত হেনেছে ঠিক সেই মাটিতে, যেখানে একটা গোটা উপমহাদেশ গত তিন দশক ধরে তার মধ্যবিত্ত স্বপ্নের ভিত গেঁথেছে ‘হোয়াইট কলার’ (White-Collar) জব হিসাবে।
এআই-এর আঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ১০টি পেশা
দশটা পেশা — যেখানে এআই-এর প্রকৃত আঘাত সবচেয়ে বেশি। তালিকাটা একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।
কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শীর্ষে — পঁচাত্তর শতাংশের কাছাকাছি এক্সপোজার। তারপর গ্রাহক সেবা প্রতিনিধি (Customer Support), সত্তর শতাংশের বেশি। তারপর একে একে ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, মেডিকেল রেকর্ড স্পেশালিস্ট, মার্কেট রিসার্চ অ্যানালিস্ট, সেলস রিপ্রেজেন্টেティブ, ফিনান্সিয়াল অ্যানালিস্ট, সফটওয়্যার কোয়ালিটি টেস্টার, ইনফরমেশন সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট এবং কম্পিউটার ইউজার সাপোর্ট স্পেশালিস্ট।

এই তালিকাটা একটা চেনা প্যাটার্নের ইশারা দেয়, প্রায় সূত্রের মতো নির্ভুল। যে কাজে নিয়ম আছে, পুনরাবৃত্তি আছে, কাঠামো আছে, যে কাজ হিউম্যান টাচ ছাড়াই করে ফেলা যায় ধাপে ধাপে অ্যালগরিদমে — সেই কাজে এআই দ্রুত ঢুকে পড়ছে। আর যে কাজে শরীর লাগে, সরাসরি মানুষের বিচারবুদ্ধি লাগে, সহানুভূতি লাগে, শারীরিক উপস্থিতি লাগে — সেই কাজে এআই-এর छायाও পড়েনি এখনও। বাবুর্চি, মেকানিক, বারটেন্ডার, লাইফগার্ড — এদের এক্সপোজার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। একটা সফটওয়্যার আপনার হাতের পোড়া দাগ বুঝবে না, একটা ভাষাকল্প আপনার গাড়ির ইঞ্জিনের গন্ধ থেকে গোলযোগ আঁচ করতে পারবে না।
কিন্তু ভারতের গল্পটা এই গড়পড়তা বিশ্বচিত্রের চেয়ে আলাদা। ভারতের গল্পটা অনেক বেশি ভয়ের, অনেক বেশি ব্যক্তিগত — কারণ ভারত নিজের অর্থনীতির ভিতটাই গেঁথেছিল ঠিক সেই কাজগুলোর উপর, যেগুলো আজ তালিকার শীর্ষে।
ভারতের আইটি-বিপিও সাম্রাজ্যে ফাটল
গত তিন দশকে ভারত একটা অর্থনীতি বানিয়েছে, ইটের পর ইট, ঠিক সেই কাজগুলোর উপর দাঁড় করিয়ে — যেগুলো এআই আজ সবচেয়ে দ্রুত গিলে খাচ্ছে। কোডিং, ডেটা এন্ট্রি, কাস্টমার সাপোর্ট, কোয়ালিটি টেস্টিং, ব্যাক-অফিস প্রসেসিং — এই কাজগুলো বিক্রি করেই গড়ে উঠেছিল ভারতের আইটি-বিপিও সাম্রাজ্য। পশ্চিমের কোম্পানিগুলো সস্তায়, দক্ষ শ্রমে এই কাজ আউটসোর্স করত বেঙ্গালুরু-হায়দরাবাদ-পুনেতে; বিনিময়ে গড়ে উঠেছিল একটা গোটা প্রজন্মের সংসার, সন্তানের ইংরেজি-মাধ্যম স্কুল, প্রথম ফ্ল্যাটের ইএমআই, পুজোর সময় বিদেশযাত্রার স্বপ্ন।
সেই মডেলটাই এখন ফাটল ধরছে। আর ফাটলটা শুরু হচ্ছে ঠিক সেইখান থেকে, যেখানে পিরামিডের ভিত — অসংখ্য জুনিয়র কর্মী, যাদের কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকে গোটা কাঠামো।
সংখ্যাটা প্রথমে শোনা যাক, কারণ সংখ্যাই এখানে সবচেয়ে নির্মম সাক্ষী, আবেগহীন বিচারক।
২০২৫ সালে ভারতের আইটি খাতে চাকরি হারিয়েছেন এক লক্ষেরও বেশি মানুষ। এই স্রোত থামেনি — ২০২৬-এর প্রথম ছয় মাসেই বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতে ছাঁটাই পেরিয়ে গেছে এক লক্ষ আটষট্টি হাজার, আর তার একটা বড় ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে বেঙ্গালুরু-হায়দরাবাদ-চেন্নাইয়ের গায়ে।
কোম্পানিভিত্তিক হিসেবটা আরও নির্দিষ্ট, আরও নিরেট। ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে দেশের পাঁচটা শীর্ষ আইটি সংস্থা — টিসিএস, ইনফোসিস, উইপ্রো, এইচসিএলটেক, টেক মাহিন্দ্রা — সম্মিলিতভাবে নতুন কর্মী যোগ করেছে মাত্র সতেরোজন। সতেরো। আগের বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল আঠারো হাজার। হাজার থেকে এককে নেমে আসার এই পতনটাই বলে দেয় গল্পটা কতটা আকস্মিক。
টিসিএস একাই ২০২৫-এ ছাঁটাই করেছিল বারো হাজার কর্মী, আর ২০২৬ অর্থবছরে আরও তেইশ হাজার চারশো ষাটজন — নিজস্ব ব্যাখ্যায়, “এআই-ফার্স্ট সার্ভিস মডেলে” রূপান্তরের জন্য। ওরাকল একটা সকালেই ভারতে ছাঁটাই করেছে প্রায় বারো হাজার মানুষ, আইআইটি ও এনআইটির পঞ্চাশটির বেশি ক্যাম্পাস অফারও বাতিল করে দিয়েছে একসঙ্গে — যে চিঠিগুলো হাতে নিয়ে তরুণরা বাবা-মাকে গর্বের সঙ্গে দেখিয়েছিল, সেই চিঠিগুলোই কয়েক মাস পরে অর্থহীন কাগজ হয়ে গেছে। অ্যামাজন তার ভারতীয় কর্পোরেট পদগুলো কাটছাঁট করেছে বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, হায়দরাবাদ জুড়ে। অ্যাকসেঞ্চার, ফ্লিপকার্ট, লিভস্পেস, ওলা ইলেকট্রিক — তালিকাটা দীর্ঘ হতেই থাকছে। উইপ্রো ফ্রেশার নিয়োগের লক্ষ্য কমিয়ে দিয়েছে প্রায় অর্ধেক; প্রায় দুশো নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের জয়েনিং তারিখ পিছিয়ে গেছে সাত মাসের বেশি — একটা চাকরি, যা কাগজে আছে, বাস্তবে নেই।
ইনফোসিসের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানির একটা বাক্যে পুরো পরিবর্তনের সারাংশ ধরা পড়ে — কোড লেখাটা আর লক্ষ্য থাকবে না; লক্ষ্য থাকবে এআইকে কাজ করানো। বাক্যটা ছোট, প্রায় নিরীহ। কিন্তু এর নিচে যে অর্থনৈতিক ভূমিকম্প লুকিয়ে আছে, একটা গোটা প্রজন্ম এখনও তার মাত্রা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি।
নির্দিষ্টভাবে কোন কোন কাজ হারিয়ে যাচ্ছে?
এই সংখ্যাগুলোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন — কোন কাজগুলো নির্দিষ্টভাবে হারিয়ে যাচ্ছে?
প্রথম শ্রেণি — গ্রাহক সেবা ও সাপোর্ট: যেখানে নিয়ম আছে, পুনরাবৃত্তি আছে, সৃজনশীলতা কম। ব্লকের মতো সংস্থায় এআই চ্যাটবট এখন সত্তর থেকে আশি শতাংশ গ্রাহক-প্রশ্নের সমাধান করে দিচ্ছে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই। ভারতের যে বিপুল বিপিও বাহিনী এতদিন রাত জেগে পশ্চিমা গ্রাহকদের ফোন ধরত, তাদের জায়গায় এখন বসছে একটা সফটওয়্যার, যার বেতন লাগে না, ছুটি লাগে না, রাত জাগতে আপত্তি নেই, আর মেজাজও হারায় না।
দ্বিতীয় শ্রেণি — সফটওয়্যার টেস্টিং ও কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স: কোড লেখার পর সেই কোডে ভুল খোঁজার কাজটা একসময় গোটা একটা টিমের দায়িত্ব ছিল — এখন এআই নিজেই কোড লেখে, নিজেই পরীক্ষা করে, নিজের ভুল নিজেই ধরে।
তৃতীয় শ্রেণি — ডেটা এন্ট্রি ও রিপোর্টিং: ডেটা এন্ট্রি, ডকুমেন্টেশন, টিকিট সামারাইজেশন, রিপোর্টিং। এই কাজগুলোর সংজ্ঞাই হলো তথ্য নেওয়া, গুছিয়ে দেওয়া, লিখে রাখা — এআই-এর জন্য এর চেয়ে স্বাভাবিক কাজ আর কিছু হতে পারে না।
চতুর্থ শ্রেণি — এন্ট্রি-লেভেল কোডিং: বিশেষত সেই প্রজেক্ট, যেখানে কাঠামো নির্দিষ্ট, যুক্তি সরল। যে কাজ একসময় একটা গোটা জুনিয়র টিম করত, এখন একজন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার এআই সহকারী নিয়ে একাই সারছেন। ফলাফল নির্মম রকমের সরল — জুনিয়র পদেরই আর প্রয়োজন পড়ছে না।
এই চারটে শ্রেণির একটা মিল আছে, যা প্রায় কাকতালীয় নয়। এগুলোই ছিল ভারতের তথাকথিত “পিরামিড মডেল”-এর ভিত্তি-পাথর — প্রচুর জুনিয়র নিয়োগ করো সস্তায়, ট্রেনিং দাও, প্রজেক্টে লাগাও, বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে উপরে তোলো, আর সেই বিপুল জুনিয়র বাহিনীর শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকুক হাতে গোনা কয়েকজন সিনিয়রের মুনাফা। পিরামিডের সেই ভিতই এখন ভাঙছে, ইটে ইটে।
নতুন নিয়োগের দরজা নিঃশব্দে বন্ধ হওয়া
ছাঁটাই দৃশ্যমান, খবরে আসে, টিভি চ্যানেলে বিতর্ক তৈরি করে। কিন্তু যা নিঃশব্দে ঘটছে, তা আরও গভীর ক্ষত — নতুন নিয়োগের দরজা চুপচাপ বন্ধ হয়ে যাওয়া। ছাঁটাই হওয়া মানুষটার একটা নাম আছে, একটা গল্প আছে, পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়। যে তরুণ-তরুণী চাকরিই কখনও পেল না, তার কোনো গল্প নেই — শুধু একটা সংখ্যা, পরিসংখ্যানের গভীরে চাপা পড়ে থাকা একটা নীরবতা।
২০২২ অর্থবছরে, কোভিড-উত্তর উন্মাদনার বছরে, ভারতের আইটি খাতে ফ্রেশার নিয়োগ হয়েছিল ছয় লক্ষের কাছাকাছি। ২০২৫ অর্থবছরে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় এক লক্ষ কুড়ি হাজারে — তিন বছরে আশি শতাংশ পতন। সহজ কথায়, ২০২২ সালে একজন ফ্রেশারের জন্য যে পাঁচটা চাকরি খোলা ছিল, আজ তার মধ্যে চারটেই অদৃশ্য।
২০২৬-এর জুনে সক্রিয় চাকরির সংখ্যা আটাশ মাসের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে — তিরানব্বই হাজার পদ, যেখানে মার্চেও ছিল এক লক্ষ ঊনিশ হাজার। আর এই তিরানব্বই হাজার পদের মধ্যে ফ্রেশারদের জন্য বরাদ্দ মাত্র তেরো শতাংশ। প্রতিযোগিতার মাত্রাটা বুঝতে একটা সংখ্যাই যথেষ্ট — একটা খোলা পদে আবেদনকারীর সংখ্যা ২০২২-এর তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। বাইশ থেকে পঁচিশ বছর বয়সী যে তরুণরা এআই-উন্মুক্ত পেশায় কাজ খুঁজছে, তাদের বেকারত্ব বেড়েছে প্রায় চৌদ্দ শতাংশ।

আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের “স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬” রিপোর্ট আরও একটা নির্মম সত্য তুলে ধরেছে — পনেরো থেকে পঁচিশ বছর বয়সী স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার চল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি, আর এই সংখ্যাটা গত চার দশক ধরে প্রায় অপরিবর্তিত। এই বাক্যটায় একটু থেমে পড়া দরকার। এআই নতুন সংকট তৈরি করেনি — একটা পুরনো, বহু পুরনো কাঠামোগত সংকটের ওপর শুধু একটা নতুন, ধারালো স্তর চাপিয়ে দিয়েছে।
ভারতে প্রতি বছর কুড়ি লক্ষের বেশি ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতক বেরোয়, আর তাদের সিংহভাগের গন্তব্য ছিল এই একই আইটি-বিপিও বাস্তুতন্ত্র। একটা প্রজন্ম যে পথে হাঁটার কথা ছিল — বোর্ড পরীক্ষা, জেইই (JEE) বা রাজ্য CET, বি.টেক (B.Tech) ডিগ্রি, ইনফোসিস বা টিসিএসের ক্যাম্পাস অফার, একটা মাসিক বেতন যা পরিবারের গোটা গতিপথ বদলে দেয় — সেই পথটাই আজ আর নিশ্চিত নয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এআই-এর কারণে আমাদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তা বিস্তারিত জানতে পড়ুন আমাদের বিশেষ প্রতিবেদন: আসছে AGI: ধ্বংসের মুখোমুখি আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা !
আর একটা সংখ্যা এই গোটা বিভাজনের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ সারাংশ বলে দেয়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে, জুনিয়র ও মধ্য-স্তরের আইটি কর্মীদের প্রকৃত বেতন কমেছে চার থেকে ছয় শতাংশ — মূল্যস্ফীতি ধরলে। অথচ একই সময়ে এআই-বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়াররা পাচ্ছেন চল্লিশ থেকে আশি শতাংশ বেশি বেতন। একই অফিস-বিল্ডিং, একই কোম্পানির লোগো, একই ক্যান্টিনে দুপুরের খাবার — কিন্তু ভেতরে ভেতরে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা পৃথিবী তৈরি হয়ে গেছে। একটা সংকুচিত হচ্ছে, আরেকটা প্রসারিত হচ্ছে। আর এই দুটো পৃথিবীর মাঝখানের দূরত্ব বাড়ছে প্রতি ত্রৈমাসিকে।
গবেষণার চোখ: ভারত বনাম আমেরিকার দ্বৈত দুর্বলতা
এতদূর যা বলা হলো, তা সংবাদমাধ্যম আর শিল্পের নিজস্ব হিসেব। কিন্তু গবেষণার জগৎ যখন একই প্রশ্নে মুখোমুখি বসে, তখন উত্তরটা আরও কাঠামোগত, আরও নির্মম হয়ে ওঠে।
আইআইটি যোধপুরের দুই গবেষক, ভেঙ্কট রাম রেড্ডি গানুথুলা ও কৃষ্ণ কুমার বালারামন, একটা তুলনামূলক গবেষণাপত্র লিখেছেন — ভারত আর আমেরিকার শ্রমবাজারকে পাশাপাশি রেখে, প্রায় ময়নাতদন্তের মতো নিখুঁতভাবে। তাঁদের পরিসংখ্যান ভয়ংকর স্পষ্ট।
ভারতে নিম্ন-দক্ষতার কাজে নিয়োজিত কর্মীর অনুপাত সাতান্ন শতাংশ; আমেরিকায় চব্বিশ শতাংশ। উচ্চ-দক্ষতার কাজে ভারতের অংশ মাত্র আট শতাংশ; আমেরিকায় তেত্রিশ শতাংশ। অটোমেশন-ঝুঁকির গড় স্কোরও ভারতে বেশি — উনত্রিশের কাছাকাছি, আমেরিকায় ছাব্বিশ।
কিন্তু সবচেয়ে নির্মম সংখ্যাটা আসে যখন এই দুটো বিষয়কে একসঙ্গে রাখা হয়। গবেষকরা একে নাম দিয়েছেন “দ্বৈত দুর্বলতা” — ডাবল ভালনারেবিলিটি। ভারতের নিম্ন-দক্ষতার শ্রমিকদের প্রযুক্তিগত ঝুঁকি-স্কোর ০.৮২৩, আমেরিকায় তা মাত্র ০.৩১২। অর্থাৎ ভারত শুধু বেশি মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে রেখেছে তাই নয়, সেই ঝুঁকি মোকাবিলার সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষমতাও অনেক কম — কোনো বেকারত্ব ভাতা নেই, কোনো ব্যাপক পুনর্প্রশিক্ষণ কাঠামো নেই, কোনো সামাজিক সুরক্ষাজাল নেই যা একজন ছাঁটাই হওয়া কর্মীকে ছয় মাস ভাসিয়ে রাখতে পারে।
কারণটা বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এআই-প্রস্তুতি সূচকে আরও স্পষ্ট — ভারতের স্কোর ৪২.৬, আমেরিকার ৭৮.৩। প্রায় দ্বিগুণ ব্যবধান। গবেষণাপত্রটির উপসংহার একটা বাক্যে ধরা যায় — উন্নয়নশীল অর্থনীতি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সামনে একসাথে দুটো জায়গায় দুর্বল: যে কাজগুলো তারা করে, আর সেই কাজ হারানোর পর সামলানোর সামর্থ্য। একটা নৌকা যেমন একই সঙ্গে ফুটো আর হালকা হলে দ্বিগুণ দ্রুত ডোবে।
আর একটা ঘটনা গবেষণার গণ্ডি ছাড়িয়ে সরাসরি রাজনীতির দরজায় গিয়ে কড়া নেড়েছে। এপ্রিল ২০২৬-এ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সংস্থা বার্নস্টেইন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে একটা খোলা চিঠি লেখে। ভেনুগোপাল গারে আর নিখিল আরেলার লেখা এই চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয় — জেনারেটিভ এআই-এর কারণে ভারতের কর্মসংস্থান সংকট গভীর হচ্ছে।
চিঠিটার ভাষা কূটনৈতিক, প্রায় বিনয়ী — কিন্তু বার্তাটা ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ। গত দুই দশক ধরে এক থেকে দেড় কোটি ভারতীয় আইটি ও বিপিও শিল্পে কাজ করে দেশের “উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত”-কে দাঁড় করিয়েছেন — ফ্ল্যাট কেনা, বিমানে চড়া, ভোগব্যয় বাড়ানো, সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানো। জেনারেটিভ এআই এখন সেই কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করছে। চিঠিতে আরও একটা সতর্কবার্তা — ভারত যদি নিজস্ব ফ্রন্টিয়ার এআই মডেল তৈরি না করে, তাহলে সে এআই অর্থনীতিতে চিরস্থায়ী “ভোক্তা” হয়ে থাকবে, “নির্মাতা” নয়। এআই-এর প্রকৃত মূল্য তৈরি হচ্ছে আমেরিকা আর চীনে — ভারত শুধু সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, গড়বে না।
এআই-ই কি একমাত্র কারণ? একটি বিকল্প বিতর্ক
তবে এখানে একটা সৎ স্বীকারোক্তি জরুরি, না হলে ছবিটা অসম্পূর্ণ, প্রায় প্রচারণার মতো একপেশে থেকে যায়।
পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সের একটা সাম্প্রতিক পর্যালোচনা দেখাচ্ছে — সব গবেষকই একমত নন যে চাকরি হারানোর পেছনে এআই-ই একমাত্র বা প্রধান কারণ। একদল গবেষক, যেমন ইশচেঙ্কো ও মিলেট, দেখিয়েছেন এআই-উন্মুক্ত পেশায় চাকরির বিজ্ঞাপন কমতে শুরু করেছিল ২০২২ সালেই — চ্যাটজিপিটি প্রকাশের আগেই। তাঁদের যুক্তি, এই পতনের সময়রেখা এআই-এর আবির্ভাবের চেয়ে সুদের হার বৃদ্ধির মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক কারণের সঙ্গে বেশি মেলে।
এই বিতর্কটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটা সরলীকরণ থেকে বাঁচায় — আর সরলীকরণ সবসময়ই সবচেয়ে আরামদায়ক মিথ্যা। সত্যটা সম্ভবত দুটোর মিশ্রণ। সুদের হার বৃদ্ধি আর বৈশ্বিক মন্দার চাপ একটা সংকোচনকে শুরু করেছিল, প্রথম ফাটলটা ধরিয়েছিল দেয়ালে; তারপর এআই এসে সেই সংকোচনকে স্থায়ী, কাঠামোগত রূপ দিয়েছে। আগে যেটা ছিল চক্রাকার মন্দা, সেটাই এখন স্থায়ী পুনর্বিন্যাস। কোম্পানিগুলো এখন প্রকাশ্যেই এআই-কে কারণ হিসেবে নাম দিচ্ছে, যেটা ২০২২-২৩ সালের ছাঁটাইয়ে দেখা যায়নি — আর এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তিটাই বলে দেয়, গল্পটা এখন আর লুকোনোর প্রয়োজন কেউ বোধ করছে না।
আশার আলো: গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার (GCC) এবং নতুন রূপান্তর
পুরো ছবিটা শুধু অন্ধকার নয়, আর সৎ লেখক হিসেবে এই কথাটা না বললে অন্যায় হবে।
যেখানে ঐতিহ্যবাহী আইটি সার্ভিস সংকুচিত হচ্ছে, সেখানে এক নতুন গন্তব্য বাড়ছে দ্রুত — গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার, সংক্ষেপে জিসিসি (GCC)। ওয়ালমার্ট, জেপি মরগ্যান, গোল্ডম্যান স্যাকস, শেল, অ্যাপলের মতো সংস্থা বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, পুনেতে নিজেদের অফিস বানাচ্ছে — শুধু সস্তা শ্রমের জন্য নয়, উচ্চমানের গ্লোবাল কাজের জন্য, এআই-প্রস্তুত মেধার জন্য। এটা পুরনো আউটসোর্সিং মডেল নয় — এটা এমন একটা মডেল, যেখানে ভারতীয় প্রতিভা সরাসরি বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে দাঁড়ায়, শুধু সস্তা হাত-পা হিসেবে নয়।
সামগ্রিকভাবে ভারতের আইটি খাত ২০২৬ সালে কর্মী সংখ্যা বাড়িয়েছে প্রায় এক লক্ষ চল্লিশ হাজার — এটা পতন নয়, রূপান্তর। আর একটা একক উপখাতে হিসেব সম্পূর্ণ উলটো — আইটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও সাপোর্টে এক বছরে কুড়ি শতাংশ প্রবৃদ্ধি, যখন বাকি প্রায় সবকিছু কমছে। কারণটা সরল, প্রায় কাব্যিকভাবে সরল — যে সিস্টেম এআই চালায়, সেই সিস্টেম দাঁড় করানো আর রক্ষণাবেক্ষণ করার কাজ এখনও মানুষেরই।
এই দুটো সত্যকে একসঙ্গে রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ, আসল প্রজ্ঞা। শিল্প মরছে না। শিল্পের পুরনো রূপ মরছে। একটা প্রাণী খোলস বদলায় বলেই সে মরে যায় না — কিন্তু খোলস বদলানোর মুহূর্তে সে সবচেয়ে অরক্ষিত, সবচেয়ে দুর্বল।
কোন কোন কোর্স ও স্ট্রিম আর নিরাপদ নয়?
তাহলে প্রশ্নটা ফিরে আসে মাটিতে — একজন অভিভাবক, একজন ছাত্র, একজন তরুণ পেশাজীবীর কাছে এর মানে কী। কোন স্ট্রিম আর আগের মতো নিরাপদ নয়?
১. সাধারণ কম্পিউটার সায়েন্স বা আইটি ইঞ্জিনিয়ারিং: যদি তার সঙ্গে কোনো বিশেষায়িত দক্ষতা যুক্ত না থাকে। শুধু “প্রোগ্রামিং জানি” বলাটা আর প্রতিযোগিতার মাঠে দাঁড়ানোর মতো যথেষ্ট যোগ্যতা নয়। যে কোডিং একসময় একটা নিরাপদ পেশার নিশ্চয়তা ছিল, সেটাই এখন সবচেয়ে বেশি এক্সপোজারের তালিকায় শীর্ষে — একটা নিষ্ঠুর পরিহাস।
২. ম্যানুয়াল সফটওয়্যার টেস্টিং বা QA-নির্ভর কোর্স: এই কাজের প্রায় পুরোটাই দ্রুত স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে।
৩. BPO বা কল-সেন্টার-কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ: যে শিল্প একসময় লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীকে প্রথম চাকরি দিত, সেই শিল্পের ভিত্তিটাই এখন এআই চ্যাটবট আর ভয়েস এজেন্টের হাতে চলে যাচ্ছে।
৪. সাধারণ ডেটা এন্ট্রি ও ব্যাক-অফিস প্রসেসিং: সাধারণ ডেটা এন্ট্রি, ব্যাক-অফিস প্রসেসিং, বা নথি-ব্যবস্থাপনা-নির্ভর প্রশাসনিক কোর্স। এই কাজগুলোর সংজ্ঞাই বলছে এগুলো এআই-এর জন্য সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য।
৫. একক দক্ষতা-নির্ভর কোর্স: শুধু একটা প্রোগ্রামিং ভাষা জানা, শুধু একটা টুল চালাতে শেখা, শুধু একটা সার্টিফিকেট জোগাড় করা — এই পুরনো কৌশলটা আর কাজ করছে না, কারণ একক, সংকীর্ণ দক্ষতাই এআই সবচেয়ে দ্রুত শিখে ফেলছে। যা শেখানো যায় একটা পাঠ্যবইয়ে, তা শেখানো যায় একটা মডেলকেও।
ভবিষ্যতের নিরাপদ দক্ষতা ও পেশা কোনগুলি?
এবার উলটো দিকটা — কোন স্ট্রিম, কোন দক্ষতা সত্যিই ভবিষ্যৎ-প্রমাণিত।
১. এআই ও মেশিন লার্নিং (AI/ML): বিশেষত এলএলএম ফাইন-টিউনিং (LLM Fine-Tuning) আর প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং (Prompt Engineering) — এই ক্ষেত্রের চাহিদা বাড়ছে দ্রুততম গতিতে। যে তরুণ এআই তৈরি করতে শেখে, সে প্রতিস্থাপিত হওয়ার বদলে এআই-এর নির্মাতা হয়ে দাঁড়ায় — শিকার নয়, শিকারি।
২. ক্লাউড আর্কিটেকচার ও সাইবার সিকিউরিটি: এই দুটো ক্ষেত্র প্রতিটা রিপোর্টে বারবার উঠে আসছে শীর্ষস্থানীয় চাহিদা হিসেবে। ডিজিটাল পরিকাঠামো যত বাড়বে, এই দক্ষতার প্রয়োজনও তত বাড়বে, আর এই কাজগুলোর প্রকৃতি নিয়ম-ভিত্তিক নয়, সিদ্ধান্ত-ভিত্তিক — যা এআই-কে এখনও সহজে প্রতিস্থাপন করতে দেয় না।
৩. গভীর ডোমেইন-জ্ঞানসহ ডেটা সায়েন্স: তবে একটা বিশেষ শর্তে। শুধু ডেটা বিশ্লেষণ নয়, কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের গভীর জ্ঞানের সঙ্গে মিলিয়ে। ব্যাংকিং-ফিনান্স, স্বাস্থ্য, সাপ্লাই চেইন — এই ডোমেইন-জ্ঞান যুক্ত ডেটা বিশেষজ্ঞদের চাহিদা শুধু টিকে নেই, বাড়ছে।
৪. প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট, ডেভঅপস (DevOps), ইউএক্স (UX) রিসার্চ: গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টারগুলোর সবচেয়ে বেশি চাহিদা এই পদগুলোয়, কারণ এখানে শুধু এআই-এর সঙ্গে কাজ করা নয়, এআই-চালিত পণ্য তৈরি করার সামগ্রিক বোঝাপড়া দরকার। সঙ্গে আছে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন আর রোবোটিক্স — দুটোই এমন ক্ষেত্র, যেখানে ভারতের বিনিয়োগ এখনও তুলনামূলকভাবে নতুন, ফলে প্রতিযোগিতাও কম, সুযোগ বেশি।
৫. মানবিক সংযোগভিত্তিক পেশা: সম্পূর্ণ ভিন্ন দিক থেকে — চিকিৎসা, আইনি প্র্যাকটিস, স্থাপত্য, মনোবিজ্ঞান, শিক্ষকতার মতো পেশা, যেখানে মানুষের বিচারবুদ্ধি, সরাসরি সম্পর্ক, নৈতিক দায়, শারীরিক উপস্থিতি অপরিহার্য — এসব এখনও এআই-এর নাগালের বাইরে, আর নিকট ভবিষ্যতেও থাকবে। একজন চিকিৎসক রোগীর চোখে ভয় দেখতে পান; একজন শিক্ষক ক্লাসঘরের নীরবতায় বুঝে যান কোন ছাত্রটা আজ বাড়িতে কিছু একটা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছে। এই সূক্ষ্মতা কোডে লেখা যায় না।
আইবিএমের একটা গবেষণা একটা গুরুত্বপূর্ণ ফাঁক দেখিয়ে দেয়, আর এই ফাঁকটাই আসলে সবচেয়ে বড় সুযোগের নাম। ভারতের কর্মীবাহিনীর মাত্র ত্রিশ শতাংশের কাছে এন্টারপ্রাইজ এআই গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় এআই-সাক্ষরতা আছে, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার সাতান্ন শতাংশে তোলা দরকার। সাতাশ শতাংশের এই ফাঁকটাই হলো সেই খালি জমি, যেখানে আগামী দশকের সবচেয়ে বড় কেরিয়ারগুলো গড়ে উঠবে। যে এখন এই ফাঁক ভরাট করবে, সে দাঁড়াবে সবচেয়ে শক্ত জমিতে — কারণ ফাঁকা জমিতে প্রতিযোগী কম।
এই সংকটে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের করণীয় কী?
এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে একজন ভারতীয় ছাত্র, একজন তরুণ পেশাজীবী — কী করবে?
যারা এখন স্কুলে, ভবিষ্যতের পথ বেছে নিচ্ছে — তাদের জন্য প্রথম সত্যটা মেনে নেওয়া জরুরি: ইঞ্জিনিয়ারিং আর “নিরাপদ ডিফল্ট” নয়, যদি না একটা শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে সুযোগ মেলে। বাণিজ্য পড়ুক বা বিজ্ঞান বা কলা — যাই পড়ুক না কেন, মেশিন লার্নিং আর এআই টুলের সঙ্গে পরিচিতি এখন ঐচ্ছিক বিষয় নয়, ইংরেজি বর্ণমালার মতোই অপরিহার্য একটা মৌলিক সাক্ষরতা।
যারা কলেজের শেষ বর্ষে, চাকরি খুঁজছে — তাদের জন্য প্রথম বদলটা মানসিকতার। গণহারে নিয়োগ করা পুরনো আইটি সার্ভিস কোম্পানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। প্রোডাক্ট কোম্পানি, জিসিসি (GCC) — এই গন্তব্যগুলোয় চেষ্টা করা বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ এখানেই উচ্চমানের, এআই-চালিত কাজের সুযোগ বাড়ছে দ্রুত।
যারা চাকরিতে আছেন, এক থেকে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতায় — তাঁদের দরকার একটা সৎ আত্ম-নিরীক্ষা, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একটা কঠিন প্রশ্ন করা। নিজের দৈনন্দিন কাজগুলোর দিকে তাকানো — কোনগুলো এআই করে দিতে পারে আজই। এই প্রশ্নের উত্তর যদি ভয়ংকর মনে হয়, তাহলে আগামী ছয় থেকে বারো মাস বিনিয়োগ করা দরকার নতুন দক্ষতায়। বুটক্যাম্প, বাস্তব প্রজেক্ট, গিটহাব বা পোর্টফোলিওতে দৃশ্যমান কাজ — এআই-চালিত ওয়ার্কফ্লোর দিকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার এটাই সময়, দেরি করার সময় নয়।
উপসংহার: এআই কি প্রতিদ্বন্দ্বী নাকি সহযোগী?
একটা সাধারণ ভুল ধারণা ভাঙা দরকার, একদম শেষে এসে।
এআই শুধু ধ্বংস করছে না — তৈরিও করছে। এআই-সংশ্লিষ্ট ভূমিকা বছরে বছরে বাড়ছে পঞ্চাশ থেকে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি হারে। প্রশ্নটা তাই “চাকরি থাকবে কিনা” নয়। প্রশ্নটা — কোন ধরনের মানুষ থাকবে, কোন ধরনের মানুষ থাকবে না।
আমাদের সামনে মূলত দুটো পথ খোলা। এক, এমন এক মানবিক দক্ষতায় নিজেকে দক্ষ করে তোলা যেখানে এআই এখনও পৌঁছাতে পারেনি — যেমন সহানুভূতি, মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন ও জটিল বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ। দুই, এআই-কে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে নিজের কাজের সুযোগ ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরম শক্তিশালী সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করা। ভবিষ্যতের লড়াইটা মানুষের সাথে এআই-এর নয়; বরং লড়াইটা হবে এআই ব্যবহারকারী মানুষের সাথে এআই ব্যবহার না করা মানুষের। সিদ্ধান্ত এখন আমাদের হাতে।