গত দুই বছরে গ্লোবাল এআই (AI) যুদ্ধের মানচিত্রে চীন থেকে উঠে আসা মডেলগুলোর তালিকাটি কেবল দীর্ঘই হচ্ছে না, পশ্চিমা ফ্রন্টিয়ার ল্যাবগুলোর একাধিপত্যকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
ডিপসিক (DeepSeek v4 pro)-এর বিস্ময়কর বৈশ্বিক ঝড়ের সমান্তরালে এখন দাঁড়িয়ে গেছে মিনিম্যাক্স (MiniMax M3), কোয়েন (Qwen 3.7 max), zai-এর জিএলএম (GLM 5.2), মুনশটের কিমি (Kimi 2.7 Coder) এবং এমনকি হার্ডওয়্যার জায়ান্টের ল্যাব থেকে আসা শাওমির মিমো (Xiaomi Mimo 2 Pro)। চীনের এই ওপেন সোর্স মডেলগুলির সাথে আমেরিকান কমার্শিয়াল মডেলের মধ্যকার প্রযুক্তিগত ব্যবধান এখন আর নেই বললেই চলে। গ্লোবাল বেঞ্চমার্কে এই চীনা মডেলগুলো ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের সমকক্ষ বা অনেক ক্ষেত্রে তাদের চেয়ে উন্নত স্কোর তুলছে।
এআই-এর এই মহাযুদ্ধে নিজেকে তৃতীয় শক্তি হিসেবে দাবী করা ভারতের অবস্থান ঠিক কোথায়? ‘ইন্ডিয়াএআই মিশন’-এর রাষ্ট্রীয় বাজেটই ১০,৩৭১ কোটি টাকা ঘোষণা করা হয়েছিল। ভারতে প্রতিভার অভাব তখনও ছিল না, এখনও নেই — আইআইটি, পিএইচডি এবং বিশ্বমানের কোটি কোটি কোডারের দেশ ভারত। অভাব ছিল না সময়েরও — ওপেনএআই-এর স্যাম অল্টম্যান যখন তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন যে ভারত কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ করেও চ্যাটজিপিটির প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি করতে পারবে না, তখন থেকে আজ প্রায় তিন বছর পার হয়ে গেছে। তবুও আজ পর্যন্ত কোনো ভারতীয় লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) গ্লোবাল ফ্রন্টিয়ার লেভেলে পৌঁছাতে পারেনি।
গ্লোবাল এআই ব্যাটেলফিল্ড মানচিত্রে ভারতের এই অবস্থায় থাকার পেছনে তাহলে আসল কারণ কী? আসলে এক্ষেত্রে সবথেকে বড় অপ্রিয় সত্য হলো — প্রযুক্তিগত অক্ষমতা নয়, বরং কোন খাতে নিজেদের শক্তি ও অর্থ ঢালা হবে — সেই ‘রাজনৈতিক ও কৌশলগত পছন্দ’ (Political Choice)-ই ভারতকে এই প্রতিযোগিতায় ছিটকে দিয়েছে।
আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা বনাম ভারতের প্রাচুর্য: সংকটের ভিন্ন রূপ
আমেরিকার কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা ২০২২ সাল থেকে চীনকে এনভিডিয়ার (Nvidia) সবচেয়ে উন্নত চিপগুলো (যেমন H100, B200) থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। কিন্তু এই তীব্র প্রতিবন্ধকতার ভেতরেই জন্ম নিয়েছে আজকের চীনা এআই বিপ্লব। যেখানে আমেরিকার একটি মডেল ট্রেইন করতে শত মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছিল, সেখানে চিপের এই সীমাবদ্ধতাই চীনা ল্যাবগুলোর জন্য উদ্ভাবনের মূল চালিকাশক্তি বা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রেইন্ট’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যা তাদের অ্যালগরিদমিক দক্ষতার চরম শিখরে নিয়ে যায়।
ভারতের পরিস্থিতি ঠিক এর বিপরীত। ভারতের ওপর কোনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নেই, চিপ আমদানির অবাধ স্বাধীনতা রয়েছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, ইন্ডিয়াএআই মিশনের অধীনে প্রায় ৩৪,০০০ জিপিইউ (GPU) স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই বিপুল কম্পিউট পরিকাঠামো সত্ত্বেও কোনো যুগান্তকারী ফলাফল আসেনি! সম্পদের এই প্রাচুর্য অথচ আউটপুটের এই শূন্যতাই প্রমাণ করে যে, সংকটটি প্রযুক্তির সক্ষমতার নয়; সংকটটি রাষ্ট্র ও পুঁজির দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের অগ্রাধিকারের।
চীনের ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর বৈশ্বিক আধিপত্য
চীনের মডেলগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায় তারা কীভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড সেট করে দিচ্ছে।
- জিএলএম ৫.২ (GLM 5.2): সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব থেকে উঠে আসা এই মডেলটি মাল্টিমোডাল রিজনিং এবং বৈজ্ঞানিক সমস্যা সমাধানে আমেরিকার ক্লড ফেবল ৫ বা জিপিটি-৫.৫ ও-এর সমকক্ষ পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে।
- কিমি ২.৭ কোডার (Kimi 2.7 Coder): মুনশট এআই-এর তৈরি এই মডেলটি লং-কনটেক্সট উইন্ডো এবং বিশেষ করে প্রোগ্রামিং ও কোড জেনারেশনে বিশ্বসেরা বেঞ্চমার্ক স্পর্শ করেছে, যা বিশ্বজুড়ে ডেভেলপারদের প্রথম পছন্দে পরিণত হয়েছে।
ভারতের এআই নীতি: প্রতিক্রিয়াশীল ও বিকেন্দ্রীভূত নীতিনির্ধারণ
ভারতের এআই নীতি সর্বদাই ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ (Reactive)। ২০২৩ সালে অল্টম্যানের মন্তব্যের তড়িঘড়ি প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নেয় ‘ক্রুত্রিম’। আবার ২০২৫-এর শুরুতে ডিপসিক এবং চীনা মডেলগুলোর ধাক্কায় যখন বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজার ও দেশীয় শেয়ারবাজারে ধস নামে, তখন ভারত সরকার হঠাৎ নিজস্ব এলএলএম বানানোর ঘোষণা দেয়।
ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্যে মনোযোগ দেওয়ার পরিবর্তে, সরকার ১২টি আলাদা সংস্থাকে ছোট-বড় এলএলএম ও এসএলএম (SLM) বানানোর অনুমোদন দেয়। চীনের সুনির্দিষ্ট ও কেন্দ্রীভূত ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর বিপরীতে ভারতের পুঁজি ও মেধা ১২টি সমান্তরাল, মাঝারি ও বিক্ষিপ্ত প্রচেষ্টায় এলোমেলো হয়ে যায়। এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়, এটি ভারতের নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শিতার অভাব এবং সিদ্ধান্তহীনতার রাজনীতি।
পুঁজি কোথায় গেল — গবেষণায় নয়, ক্ষমতার বৃত্তে
প্রশ্নটা শুধু “ভারতীয় পুঁজিপতিরা কেন রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (R&D)-তে বিনিয়োগ করেননি” তা নয়; বরং আরও গভীর — “তাহলে সেই বিপুল উদ্বৃত্ত টাকা আসলে গেল কোথায়?”
গবেষণায় ভারতীয় বেসরকারি খাতের চরম অনীহা নিচের বৈশ্বিক তুলনামূলক টেবিলটি দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়:
| দেশ | মোট R&D ব্যয়ের মধ্যে বেসরকারি খাতের অবদান |
|---|---|
| দক্ষিণ কোরিয়া | ৭৯% |
| চীন | ৭৭% |
| আমেরিকা | ৭৫% |
| ভারত | মাত্র ৩৭% – ৪১% |

অর্থনৈতিক সমীক্ষা নিজেই স্বীকার করেছে যে, ভারতের বেসরকারি খাত উদ্ভাবনের চেয়ে অনুকরণেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ভারতের শীর্ষ ১০টি লাভজনক বেসরকারি সংস্থা, যাদের সম্মিলিত বার্ষিক মুনাফা প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার, তারা গবেষণার পেছনে ১ বিলিয়ন ডলারও খরচ করেনি। ভারতের কর্পোরেট সেক্টরে মুনাফা বিশ্বের সর্বোচ্চ হারের কাছাকাছি হলেও, সেই মুনাফা কিন্তু গবেষণাগারে ফেরত আসে না।
তাহলে সেই টাকা যাচ্ছে কোথায়? উত্তর হলো — শেয়ারহোল্ডারদের পকেটে এবং নিরাপদ আর্থিক কৌশলে। ভারতের শীর্ষ আইটি কোম্পানিগুলো ২০২৬ অর্থবছরে তাদের মোট নিট মুনাফার রেকর্ড ৯৯.৩% ডিভিডেন্ড ও শেয়ার বাইব্যাকের মাধ্যমে শেয়ারহোল্ডারদের ফিরিয়ে দিয়েছে, যা ১০ বছর আগেও ছিল ৬৬.৮%। ইনফোসিস একাই ১৮,০০০ কোটি টাকার শেয়ার বাইব্যাক করেছে। অর্থাৎ, ভারতীয় আইটি ও কর্পোরেট সেক্টর ঝুঁকি নিয়ে নতুন কোনো এআই ফ্রন্টিয়ার তৈরি করার চেয়ে নিরাপদ মুনাফা বণ্টনেই বেশি আগ্রহী।
বিশেষ পঠনযোগ্য: ভারতীয় আইটি খাতের এই মুনাফা বণ্টন নীতি এবং এআই-এর প্রভাবে জুনিয়র কোডারদের চাকরি ও আইটি সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ সংকট নিয়ে পড়ুন আমাদের বিশেষ প্রতিবেদন: কেন ধ্বংসের পথে ভারতের আইটি ইন্ডাস্ট্রি ? ভবিষ্যতের AI নির্ভর পৃথিবীতে কোন কোন পেশা সুরক্ষিত থাকবে

আর এই একই পুঁজি রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে এবং নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ সুরক্ষিত করতে অবিশ্বাস্য রকমের উদার। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘ইলেক্টোরাল বন্ড’ প্রকল্পকে অসাংবিধানিক ও ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’-এর হাতিয়ার বলে বাতিল করে দেয়। আদালতের নথিতে দেখা যায়, এই বন্ডের সিংহভাগ (সামগ্রিকভাবে ৭৮৮ মিলিয়ন ডলার) গেছে শাসকদলের তহবিলে।
যখন দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক গবেষণার চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার নৈকট্য কেনা একটি কর্পোরেট হাউজের কাছে বেশি লাভজনক ও কম ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ বলে মনে হয় — তখন পুঁজি স্বভাবতই গবেষণাগার ছেড়ে ক্ষমতার অলিন্দে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এটি ভারতীয় পুঁজির একটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক কিন্তু দেশের জন্য ক্ষতিকর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
জাতীয় বাজেট বনাম প্রাতিষ্ঠানিক স্তরের রূঢ় বাস্তব
সংবাদপত্রের শিরোনামে ‘ইন্ডিয়াএআই মিশন’-এর ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের সংখ্যাটি দেখতে চমৎকার লাগে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক স্তরের বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত রূঢ়।
- বিজ্ঞান ধারা প্রকল্প: ভারতের মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার প্রধান চালিকাশক্তি ‘বিজ্ঞান ধারা’ প্রকল্পের বাজেট ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৫-২৬ সালের মধ্যে ৬৭.৫% হ্রাস পেয়েছে।
- ন্যাশনাল সুপারকম্পিউটিং মিশন (NSM): যে মিশনের ওপর ভারতের কম্পিউট পরিকাঠামো দাঁড়িয়ে থাকার কথা, তার বাজেট ২০২৫-২৬ সালের ২৬৫ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে করা হয়েছে মাত্র ১ লক্ষ টাকা! এটি কার্যত একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মিশনকে বাজেট-শূন্য বা টোকেন অ্যাকাউন্টে পরিণত করার শামিল।
- গবেষকদের বৃত্তি সংকট: আইআইটি (IIT) এবং আইআইএসইআর (IISER)-এর মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের পিএইচডি গবেষকরা (INSPIRE স্কলার) ৩ থেকে ৯ মাস ধরে তাদের মাসিক বৃত্তি (Stipend) পাচ্ছেন না। মাসের পর মাস ইমেইল ও ফোনের কোনো জবাব মেলে না। এটি অর্থের অভাব নয়, এটি প্রশাসনিক উদাসীনতা এবং এই বার্তা যে — গবেষকদের অপেক্ষা করিয়ে রাখা যায়।
রাষ্ট্র কোন ধরণের গবেষণায় টাকা দেয়: অপবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকার
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র এবং অগ্রাধিকার বোঝা যায় সে কোন ধরনের গবেষণায় রাষ্ট্রীয় অর্থ বরাদ্দ করছে, তা লক্ষ্য করলে।
২০১৯ সালে গঠিত পাঁচশো কোটি টাকার ‘রাষ্ট্রীয় কামধেনু আয়োগ’ ঘোষণা করে যে, গোবর ও গোমূত্রভিত্তিক বাণিজ্যিক স্টার্টআপদের ৬০% পর্যন্ত মূলধন সরকার জোগাবে। ২০২০ সালে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রক ‘সুত্র-পিক’ (SUTRA-PIC) কর্মসূচি চালু করে, যেখানে গোমূত্র ও গোবর থেকে ক্যানসারের ওষুধ, শ্যাম্পু ও তেল তৈরির জন্য দেশের বিজ্ঞানীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এমনকি আয়োগের তৎকালীন চেয়ারম্যান দাবি করেন, গোবরের তৈরি চিপ মোবাইল ফোনের ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয়তা রুখে দেয়।
এই প্রবণতা কিন্তু থামেনি। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও মধ্যপ্রদেশের নানাজি দেশমুখ ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গোবর ও গোমূত্র দিয়ে ক্যানসার গবেষণার সাড়ে তিন কোটি টাকার বাজেটের এক বিরাট অংশ কাঁচামাল ও গবেষকদের একাধিক ‘গোয়া ভ্রমণ’-এর বৃত্তিতে খরচ হয়েছে, যার কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক আউটপুট নেই। ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, গোমূত্রে এমন কোনো যৌগ নেই যা ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে পারে।
একদিকে প্রকৃত পিএইচডি গবেষকের মাসিক মাত্র ৩৭,০০০ টাকার বৃত্তি মাসের পর মাস আটকে থাকে, অন্যদিকে ছদ্মবৈজ্ঞানিক গবেষণায় কোটি কোটি টাকা ও ভ্রমণ-ভাতা অনায়াসে মঞ্জুর হয় — এই বৈপরীত্যই বলে দেয় ভারতের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের রিমোট কন্ট্রোলটি কার হাতে।
বিজ্ঞান কংগ্রেস বনাম পৌরাণিক চাটুকারিতা: প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা
বিজ্ঞানকে যখন রাজনৈতিক মতাদর্শের অধীনস্থ করা হয়, তখন গবেষণার পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে যায়। ‘ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস’-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চ গত এক দশকে বিজ্ঞানীদের গবেষণার চেয়ে অবৈজ্ঞানিক ও পৌরাণিক দাবির সার্কাসে পরিণত হয়েছে। ২০১৫ সালে বৈদিক বিমানের দাবি, ২০১৯ সালে কৌরবদের স্টেম-সেলের মাধ্যমে জন্মের তত্ত্ব, কিংবা আইনস্টাইন-নিউটনকে ভুল প্রমাণ করে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের নাম “নরেন্দ্র মোদী তরঙ্গ” রাখার দাবি — এই মঞ্চগুলো থেকেই প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা পেয়েছে।
যখন দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব পৌরাণিক আখ্যানকে প্লাস্টিক সার্জারির প্রাচীন প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন, কিংবা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা ডারউইনের বিবর্তনবাদকে পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলেন, তখন রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভেতরে থাকা তরুণ বিজ্ঞানী ও গবেষকদের কাছে একটি অত্যন্ত ক্ষতিকর বার্তা পৌঁছায়: যাচাইযোগ্য বৈজ্ঞানিক সত্যের চেয়ে রাজনৈতিক আখ্যান ও প্রাচীন গৌরবের চাটুকারিতা করা অনেক বেশি নিরাপদ ও লাভজনক।
মেধা, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও ‘ব্রেন ড্রেন’
গ্লোবাল হিউম্যান ক্যাপিটাল সূচক অনুযায়ী, ভারতের মেধা-ধরে-রাখার (Talent Retention) সূচক ঋণাত্মক (-০.৩২), যেখানে চীনের এই সূচক ধনাত্মক (+০.৩৮)। ভারতের আইআইটি বা আইআইএসসি থেকে পাস করা সেরা মেধার একটা বিরাট অংশ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এর কারণ শুধু উন্নত জীবনযাত্রা নয়, বরং ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য নিয়োগ, সিলেবাস পরিবর্তন এবং গবেষণার স্বায়ত্তশাসনে লাগাতার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। যখন প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য এবং চিন্তার স্বাধীনতা রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে, তখন সৃজনশীল ও উচ্চমানের এআই গবেষণার মতো জটিল কাজগুলো করার মতো মুক্ত পরিবেশ আর অবশিষ্ট থাকে না।
ক্রুত্রিম (Krutrim): জাতীয়তাবাদী আবেগ বনাম ফ্রন্টিয়ার এলএলএম-এর বাস্তব চিত্র
২০২৩ সালে স্যাম অল্টম্যানের চ্যালেঞ্জের জবাবে ওলা (Ola)-র ভাবিশ আগরওয়াল ভারতের নিজস্ব এআই হিসেবে ‘ক্রুত্রিম’ (Krutrim) চালু করেছিলেন। একে একটি “জাতীয় মিশন” হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছিল, ব্যাপক প্রচারও করা হয়। কিন্তু তিন বছর পর, ২০২৬ সালের বাস্তবতা কী?
- কর্মী ছাঁটাই: কর্মী সংখ্যা ৫৫০ থেকে নেমে বর্তমানে মাত্র ১৫০-১৬০ জনে ঠেকেছে।
- রাজস্বের ফাঁকি: ক্রুত্রিমের ৯০% রাজস্ব আসে তাদের নিজস্ব গ্রুপ কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ লেনদেন থেকে, কোনো প্রকৃত বৈশ্বিক বা দেশীয় বাজার তারা তৈরি করতে পারেনি।
- পরিকল্পনা স্থগিত: ২০২৬ সালের মে মাসে তারা তাদের নিজস্ব এআই-চিপ তৈরির উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা সম্পূর্ণ স্থগিত ঘোষণা করেছে।
ক্রুত্রিম প্রমাণ করেছে যে, কেবল সস্তা জাতীয়তাবাদী আবেগ বা রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে ফ্রন্টিয়ার এআই তৈরি করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন গভীর প্রযুক্তিগত ধৈর্য এবং দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি, যা ভারতের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে অনুপস্থিত।
সংকীর্ণ ভাষাগত ফ্রেমওয়ার্ক বনাম বৈশ্বিক কোডিং/রিজনিং লক্ষ্য
ভারতীয় এলএলএম উদ্যোগগুলোর (যেমন ক্রুট্রিম বা অন্যান্য প্রাথমিক মডেল) মূল মনোযোগ ছিল ভারতের স্থানীয় ভাষাগুলোর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা। ভারতের মতো বহুভাষিক দেশে এটি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং হাততালি পাওয়ার মতো বিষয়। কিন্তু চীন যখন GLM 5.2 বা Kimi 2.7 Coder বানাচ্ছে, তখন তাদের লক্ষ্য কেবল চীনা ভাষা ছিল না; তাদের লক্ষ্য ছিল এমন বৈশ্বিক কোডিং এবং রিজনিং টুল তৈরি করা যা জিপিটি-৪/৫ বা এনথ্রোপিকের চেয়েও সস্তা, ওপেন সোর্স এবং বিশ্বব্যাপী ডেভেলপারদের জন্য অপরিহার্য।
ভারত এআই-কে তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও বেঞ্চমার্কিংয়ের হাতিয়ার না বানিয়ে, আঞ্চলিক ভাষা ও কালচারে দক্ষ এআই-এর একটি সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে আটকে রেখেছিল। ফলে বৈশ্বিক এআই-এর মূল স্রোতে ভারত প্রবেশই করতে পারেনি।
অগ্রগতির রেখা: ভারতের সম্ভাবনা ও অনস্বীকার্য অর্জন
এই সমস্ত কাঠামোগত ব্যর্থতার মাঝেও ভারতের কিছু নিজস্ব ও অনস্বীকার্য অগ্রগতি রয়েছে, যা উল্লেখ না করলে এই বিশ্লেষণটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে:
- সর্বম ১০৫বি (Sarvam 105B): ভারতীয় ভাষার বেঞ্চমার্কে সর্বম এআই-এর এই মডেলটি অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে জিপিটি-৪-কে ৯০% সূচকে টেক্কা দিয়েছে।
- কম্পিউট ক্ষমতার বৃদ্ধি: দেশীয় ডেটা সেন্টার এবং ক্লাউড পরিকাঠামো গত তিন বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
- স্ট্যানফোর্ড এআই ইনডেক্স (Stanford AI Index): স্ট্যানফোর্ডের বৈশ্বিক সূচকে ভারত এআই বিনিয়োগ ও পরিকাঠামোয় বিশ্বের শীর্ষ তিনটি দেশের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।
এই অগ্রগতিগুলো প্রমাণ করে যে, সুযোগ ও সঠিক পরিবেশ পেলে ভারতীয় প্রকৌশলীরা মিরাকল ঘটাতে পারেন।
উপসংহার: রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দলিল
দিনের শেষে সমস্ত তথ্য ও উপাত্তকে এক সুতোয় বাঁধলে যে সত্যটি বেরিয়ে আসে, তা অত্যন্ত নির্মম।
ভারত কেন ডিপসিক, জিএলএম কিংবা কিমি কোডারের মতো মডেল বানাতে পারল না — তা কোনো চিপের অভাব বা কোডারদের মেধার ঘাটতির গল্প নয়। এটি একটি সুনির্দিষ্ট এবং সচেতন রাজনৈতিক ব্যর্থতার দলিল। যে রাষ্ট্র একই অর্থবছর-বাজেটে সুপারকম্পিউটিং মিশনকে কার্যত দেউলিয়া (মাত্র ১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ) করে দেয়, অথচ অবৈজ্ঞানিক গবেষণায় কোটি কোটি টাকা ঢেলে দেয়; যে রাষ্ট্র নিজের দেশের পিএইচডি গবেষকদের স্টাইপেন্ড আটকে রেখে শীর্ষ রাজনৈতিক পদ থেকে অপবিজ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিক সিলমোহর দেয় — সেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা এআই-এর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় জেতার নৈতিক অধিকার হারিয়ে ফেলেন।
ঠিক একইভাবে, যে পুঁজিপতি শ্রেণী দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় এক ডলার বিনিয়োগ না করে তাদের মুনাফার ৯৯.৩% টাকা ডিভিডেন্ড আর বাইব্যাকে উড়িয়ে দেয়, অথচ সুপ্রিম কোর্টের ভাষায় ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’-এর অংশ হয়ে রাজনৈতিক বন্ডের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে দ্বিধা করে না — তাদের পক্ষেও কোনো ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয়।